মোঃ মানসুর আলম সিকদার, এম.বি.এ, এল এল.বি: বিমান বন্দরের চোরেরাও রাগব-বোয়াল বলে সূত্রমতে জানা গেছে।ওরা এত শক্তিশালি যে, যুগের পর যুগ প্রকাশ্যে চুরি করেও ওদের কিছুই হচ্ছে না। কিছুদিন আগেও পত্রিকায় সবাই দেখেছিল যে, কোটি কোটি টাকার সোনা চুরি হয়েছিল কিন্তু লোক দেখানো তদন্তের মাধ্যমে ওরা সবাই পার পেয়েছিল। ঐ চোরেরা প্রয়োজনীয় সব যায়গায় নিয়মিত চাদা দিয়েথাকে দেয়। ওদের কেউ দেখেছেন যে, সম্পত্তির হিসাব যথাযথ ভাবে কোন সরকার চেয়েছে? তাই বুজতে হবে যে ওরা ক্ষমতার কোন অবস্থানে আছে, ওরা সাধারণ নয় ওরা হ্চ্ছে অসাধারন। বিমানবন্দরে সিরিজ লাগেজ বা মালামাল চুরি একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং দীর্ঘদিনের সমস্যা, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি যাত্রীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ। এটি কেন হচ্ছে এবং কেন সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ছে না, তার পেছনের মূল কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. কেন এত চুরি হচ্ছে?
বিমানবন্দরের মতো কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত এলাকায় চুরি সাধারণ কোনো ছিঁচকে চোরের কাজ নয়। এটি মূলত একটি সংগঠিত অপরাধ বা ‘ইনসাইডার জব’। এখানের লাগেজ এবং লাগেজ কেটে চুরি করে যারা মূল্যবান মালামাল নিচ্ছে তারা অত্যন্ত শক্তিশালী মাফিয়া। বিমানবন্দর একবার যদি বিদেশীদের হাতে অপারেটিং এর দায়িত্ব দিয়ে দেয় তবে এই ঘটনা একটিও ঘটবে না। কিন্তু তখন দেখবেন সব চাঁদাবাজরা এক হয়ে আন্দোলন করবে।
সিন্ডিকেট ব্যবস্থা: লোডার, ট্রলি ম্যান, ক্লিনার এবং এমনকি কিছু অসাধু নিরাপত্তা কর্মীর যোগসাজশে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করে।
ট্রানজিট পয়েন্ট: বিমান থেকে লাগেজ নামিয়ে কনভেয়ার বেল্টে আনার মধ্যবর্তী সময়ে (Ramp Area) যাত্রীদের মালামাল চুরির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে।
দ্রুত খোলার কৌশল: চোরেরা জিপার বা চেইন খোলার জন্য কলম বা ধারালো বস্তু ব্যবহার করে, যা দিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ব্যাগ খুলে মালামাল বের করে আবার আগের মতো লাগিয়ে রাখা যায়। ফলে বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না যে ব্যাগ খোলা হয়েছে।
২. সিসি ক্যামেরায় কেন ধরা পড়ছে না?
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত যৌক্তিক। বিমানবন্দর সিসি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলেও চুরির ঘটনাগুলো এমন কিছু স্থানে ঘটে যা ক্যামেরার আওতার বাইরে বা ‘ব্লাইন্ড স্পট’।
বিমানের কার্গো হোল্ড (পেট): সিসি ক্যামেরা টার্মিনালে থাকে, কিন্তু বিমানের পেটের ভেতরে (যেখানে লাগেজ রাখা হয়) কোনো সিসি ক্যামেরা থাকে না। লোডাররা যখন বিমানের ভেতরে লাগেজ লোড বা আনলোড করেন, তখন তারা ক্যামেরার নজরদারির বাইরে থাকেন। বেশিরভাগ চুরি বা মালামাল সরানোর কাজ ঠিক এই জায়গাতেই হয়। চুরি যখন হয় তখন ঐ সময় ওখানে কারা কারা ডিউটি করে সেটা কিন্তু কাস্টম্স কর্তৃপক্ষ জানে কিন্তু কর্তৃপক্ষ ঐ চোরদের খুব সহজেই ধরতে পারে কিন্তু ধরবে না।
ব্লাইন্ড স্পট ও আড়াল: অনেক সময় মালামাল নামানোর সময় কন্টেইনার বা গাড়ির আড়ালে নিয়ে যাওয়া হয়, যা ক্যামেরার ভিউ ব্লক করে দেয়।
ক্যামেরা মনিটরিংয়ে গাফিলতি: অনেক সময় মনিটরিং রুমে যারা থাকেন, তারা সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত থাকতে পারেন অথবা দায়িত্বে অবহেলা করেন, যার ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
৩. কর্তৃপক্ষ কেন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না?
কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:
সমন্বয়হীনতা: বিমানবন্দরে সিভিল এভিয়েশন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং (যেমন: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স), এবং এপিবিএন (নিরাপত্তা বাহিনী)—এই সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রায়ই সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। চুরির ঘটনা ঘটলে একে অপরকে দোষারোপ করার প্রবণতা থাকে। আসলে ওটা একটি নাটক মাত্র। কারা কারা ওখানে বিদেশিদের লাগেজের মালামাল চুরি করে সেটা মোটামুটি সবারই জানা কিন্তু কেউ ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না।
শাস্তির অভাব: চোর মাফিয়া চক্রটি এত শক্তিশালী যে, চোর ধরা পড়লে অনেক সময় লঘু শাস্তিতে ছেড়ে দেওয়া হয় বা প্রমাণের অভাবে তারা ছাড়া পেয়ে যায়, তবে সবাই জানে এটা নাটক মাত্র। কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় তারা পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হয়, দেখার যেন কেউই নাই।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের একচেটিয়া প্রভাব: বাংলাদেশে অধিকাংশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং (মালামাল ও যাত্রী সেবা) করে ‘বিমান বাংলাদেশ’। জনবল সংকট এবং তদারকির অভাবে তাদের কর্মীরা প্রায়ই অসাধু উপায়ে জাড়িয়ে পড়ে।
৪. এ দায় কার?
আইনত এবং নৈতিকভাবে এই দায় কয়েকটি পক্ষের ওপর বর্তায়:
এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ: আন্তর্জাতিক আইন (মন্ট্রিল কনভেনশন) অনুযায়ী, ব্যাগেজ চেক-ইন করার পর থেকে যাত্রীর হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত তার সম্পূর্ণ দায়ভার সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের। লাগেজ কাটা বা চুরি হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায় তাদের কিন্তু তারা এ দায় নিচ্ছে না।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং এজেন্সি: যারা শারীরিকভাবে লাগেজগুলো নাড়াচাড়া করে, তাদের কর্মীরাই চুরির সাথে সরাসরি জড়িত থাকে। তাই এর দায় তাদেরও নিতে হবে। এগুলোতে বিশ্ব-পরিমন্ডলে বাংলাদেশে ভাব-মুর্তি নষ্ট হচ্ছে।
সিভিল এভিয়েশন: বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা এবং সিসি ক্যামেরা মনিটরিংয়ের দায়িত্ব তাদের। তাই নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় তারা এড়াতে পারে না। সুত্রমতে চুরি করার সময় ইচ্ছে করেই ওখানে সিসি ক্যমেরা বন্ধ রাখা হয় অথবা ক্যমেরাটি ঘুরিয়ে রাখা হয়।
ওরা নিয়মিত চাদাদিয়ে থাকে: ঐ মাফিয়া চোরেরা বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ হতে শুরু করে এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অথবা সংস্থা নাই যে, চাঁদার ভাগ না দিয়ে থাকে। এক বার চিন্তু করে দেখুন তো এমন একটি স্পর্শকাতর স্থানে কিভাবে সিরিজ চুরিকরে পারপেয়ে যায়। এরা কি সাধারণ চোর? ওরা আন্তর্জাতিক মানের মাফিয়া স্মারটচোর। খেয়ার করে দেখুন কোন বড় মাপের রাজনীতিদি এয়াপোর্টের সিরিজ চুরির ব্যপারে একটি বাক্যও ব্যায় করে না। এগুলো বাজে নিতে হয়, ওখানে সাধারণ মানুষের কিছুই করার নাই। আমরা বড়ই অভাগা জাতি, আমাদের ভাগ্যে পরিবর্তন হবে বলে মনে হচ্ছে না, যতদিন রাজনীবিদরা ঠিক না হয়।
আপনার জন্য আমার পরামর্শ: ভবিষ্যতে ভ্রমণের সময় আপনার মূল্যবান সামগ্রী (গহনা, ল্যাপটপ, ক্যামেরা, নগদ টাকা) কখনোই চেক-ইন ব্যাগে দেবেন না, এগুলো সবসময় হ্যান্ড ব্যাগে বহন করবেন। এছাড়া হার্ড-শেল (Hard-shell) স্যুটকেস ব্যবহার করা এবং প্লাস্টিক র্যাপিং (Plastic Wrapping) করা চুরির ঝুঁকি কিছুটা কমায়।