বাংলাদেশের নন-লাইফ বিমা খাত প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে নতুন দিগন্ত উম্মোচন সম্ভব

মোঃ মানসুর আলম সিকদার: বাংলাদেশে জিডিপিতে ০.৫% এর পরিবর্তে কমপক্ষে ২.৫% অবদান রাখা সম্ভব বলে আমরা মনে করি, তাই বর্তমান প্রেক্ষা পটে বাংলাদেশের নন-লাইফ বিমা খাত প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে নতুন দিগন্ত উম্মোচন সম্ভব। বাংলাদেশের নন-লাইফ বা সাধারণ বিমা খাত মূলত এজেন্ট, ব্যাংকাসুরেন্স এবং কর্পোরেট ডিরেক্ট মার্কেটিংয়ের মতো প্রচলিত ব্যবসায়িক চ্যানেলের উপর নির্ভরশীল। তবে দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল পরিকাঠামো, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)-এর অভাবনীয় প্রসার এবং গ্রাহকদের পরিবর্তনশীল আচরণের প্রেক্ষাপটে এই খাতের জন্য নতুন এবং উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক চ্যানেল অনুসন্ধানের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুন গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো এবং বিমা কভারেজ বাড়ানোর জন্য এই নতুন চ্যানেলগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

তবে এটাও মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের মানুষ সহজে সেচ্ছায় স্ব-প্রনদিত হয়ে বীমা ঝুকি নিতে ইচ্ছুক নয়। যান-মাল রক্ষার অধিকার বাংলাদেশ সংবিধানের মৌলিক অধিকারের অংশে আত্মরক্ষার অধিকারের (Right of Private Defence) অধীনে পড়ে। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ২৬ থেকে ৪৭এ) মৌলিক অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রিমিয়ামের ভিত্তিতে অথবা বিনিময় মূল্যের উপর ভিত্তি করে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো যান-মাল সু-রক্ষা  নিশ্চিত করে থাকে। অতএব বাংলাদেশের যে কোন তৃতীয় পক্ষের যান-মাল রক্ষার অধিকার বাধ্যতামূলক ভাবে আইন করে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বের প্রায় সকল দেশে রাষ্ট্রীয় ভাবে এই আইন পরিপালন করতে রাষ্ট্রের সকল নাগরিক বাধ্য। অতএব এ আইন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও প্রজ্ঞাপন জারী করে প্রচলিত করা উচিত বলে আমরা মনে করি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং অংশীদারিত্ব-ভিত্তিক মডেলগুলোই হবে ভবিষ্যতের বিমা ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি। নিচে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নন-লাইফ বিমা সেক্টরের জন্য কিছু সম্ভাব্য নতুন ব্যবসায়িক চ্যানেল নিয়ে আলোচনা করা হলো:

. ডিজিটাল ইনসিওরটেকভিত্তিক চ্যানেলঃ

  • অনলাইন এগ্রিগেটর মার্কেটপ্লেস: তৃতীয় পক্ষের ওয়েবসাইট বা অ্যাপ, যেখানে বিভিন্ন কোম্পানির নন-লাইফ বিমা পণ্য যেমন – মোটর, স্বাস্থ্য বা ভ্রমণ বিমার তুলনা করে সরাসরি কেনা যায়। এই মডেলটি গ্রাহকদের স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য পেতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে ই-কমার্স এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেসের জনপ্রিয়তা এই চ্যানেলের সাফল্যের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করে।
  • এমবেডেড ইন্স্যুরেন্স (Embedded Insurance): এটি একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় মডেল, যেখানে অন্য কোনো পণ্য বা পরিষেবা কেনার সময় তার সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিমা সংযুক্ত থাকে। যেমন:
    • কমার্স (অনলাইন) প্ল্যাটফর্ম: অনলাইন থেকে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা অন্যান্য গ্যাজেট কেনার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিভাইসের ক্ষতির জন্য বিমা অফার করা।
    • Extended warranty Liability Policy এর মাধ্যমে নিশ্চয়তাঃ কোন প্রোডাক্ট ক্রয়ের সময় প্রথম বছর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিশ্চয়তা দিবে পরের এক বছর বীমা কোম্পানী Extended warranty Liability Policy এর মাধ্যমে নিশ্চয়তা দিবে। সেটা হতে পারে TV, Freez, AC, Mobile ইত্যাদি।
    • রাইডশেয়ারিং অ্যাপ: প্রতিটি রাইডের সাথে যাত্রীর জন্য দুর্ঘটনা বিমা অন্তর্ভুক্ত করা।
    • টিকিটিং প্ল্যাটফর্ম: বাস, ট্রেন বা বিমানের টিকিট কেনার সময় ভ্রমণ বিমা যুক্ত করার সুযোগ।
  • মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ইন্টিগ্রেশন: বিকাশ, নগদ, বা রকেটের মতো প্ল্যাটফর্মের কোটি কোটি গ্রাহককে লক্ষ্য করে ক্ষুদ্র-বিমা (Micro-insurance) পণ্য অফার করা যেতে পারে। ছোট আকারের দুর্ঘটনা বিমা, স্বাস্থ্য বিমা বা দোকানপাটের জন্য অগ্নি বিমার মতো পণ্যগুলো MFS অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই বিক্রি এবং প্রিমিয়াম সংগ্রহ করা সম্ভব।
  • টেলিযোগাযোগ কোম্পানির সাথে অংশীদারিত্ব: দেশের মোবাইল ফোন অপারেটরদের বিশাল গ্রাহক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তাদের রিচার্জ প্ল্যান বা অন্যান্য পরিষেবার সাথে ছোট অংকের ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বা স্বাস্থ্য বিমা অফার করা যেতে পারে।

. অংশীদারিত্বভিত্তিক বিকল্প চ্যানেলঃ

রিটেইল চেইন ব্র্যান্ডের সাথে সহযোগিতা: বড় সুপারশপ, ইলেকট্রনিক্স বা হোম অ্যাপ্লায়েন্সের দোকানগুলোতে পণ্য বিক্রির সময় ওয়ারেন্টি বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যের ক্ষতি বা চুরির জন্য বিমা পলিসি বিক্রি করা যেতে পারে।

  • কমিউনিটিভিত্তিক বিমা: নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের জন্য কাস্টমাইজড বিমা পণ্য তৈরি করা। উদাহরণস্বরূপ, ডাক্তারদের জন্য প্রফেশনাল ইনডেমনিটি ইন্স্যুরেন্স, নির্দিষ্ট ক্লাবের সদস্যদের জন্য গ্রুপ স্বাস্থ্য বিমা, বা কোনো অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের বাসিন্দাদের জন্য সম্মিলিতভাবে প্রপার্টি বিমা।
  • হাইরাইজ বিল্ডিং এর জন্য বাধ্যতা মূলক বীমা ব্যবস্থা
  • ইউটিলিটি কোম্পানিগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব: বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিলের সাথে ঐচ্ছিকভাবে গৃহস্থালির সরঞ্জাম বা বাড়ির জন্য দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির বিমা অফার করা যেতে পারে। এর ফলে প্রিমিয়াম সংগ্রহ করাও সহজ হবে।

৩. প্রযুক্তি-চালিত উদ্ভাবনী মডেল:

ব্যবহার-ভিত্তিক বিমা (Usage-Based Insurance – UBI): বিশেষ করে মোটর বিমার ক্ষেত্রে এই মডেলটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। গাড়িতে একটি টেলিমেটিক্স ডিভাইস ইনস্টল করে চালকের ড্রাইভিং আচরণের (যেমন গতি, ব্রেকিং) উপর ভিত্তি করে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হবে। ভালো চালকরা কম প্রিমিয়ামের সুবিধা পাবেন, যা নিরাপদ ড্রাইভিংকে উৎসাহিত করবে।

  • অনডিমান্ড ইন্স্যুরেন্স: গ্রাহকরা যখন প্রয়োজন ঠিক তখনই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিমা কভারেজ নিতে পারবেন। যেমন, শুধু ছুটির দিনে ভ্রমণের জন্য বা কোনো মূল্যবান সরঞ্জাম ব্যবহারের সময়ের জন্য বিমা কেনা।

এই নতুন চ্যানেলগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য বিমা কোম্পানিগুলোকে তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA)-কে এই উদ্ভাবনী মডেলগুলোর জন্য সহায়ক নীতিমালা তৈরি করতে হবে। গ্রাহকদের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি এবং সহজ ও দ্রুত দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এই নতুন ব্যবসায়িক চ্যানেলগুলোর সাফল্যের চাবিকাঠি হবে। যদি উপরোক্ত ব্যবস্থা চালু করা যেত তবে বাংলাদেশে জিডিপিতে ০.৫% এর পরিবর্তে কমপক্ষে ২.৫% অবদান রাখা সম্ভব বলে আমরা মনে করি।

প্রধান অবলিখক, রিপাপলিক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড।

বীমা লেখকক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *