মোঃ মানসুর আলম সিকদারঃ বাংলাদেশে বীমা খাত অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রাখে, কিন্তু দুর্নীতি এবং কিছু প্রতিকূল রাষ্ট্রীয় নীতি এর অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে বলে অনেকেই মনে করছে। বৃহৎ জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি—এসবই বীমা খাতের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি আর্থিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সচেতন হচ্ছে। কিন্তু এই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও খাতটি আস্থার সংকটে ভুগছে।
বিমা খাত মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: জীবন বিমা এবং সাধারণ বিমা। প্রিমিয়াম আয়ের সিংহভাগই আসে জীবন বিমা থেকে।
- জীবন বিমা: ২০২৪ সালে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো মোট ১২,২৬৬ কোটি টাকার প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছে। যদিও এই অঙ্কটি ২০২৩ সালের ১২,২৭৩ কোটি টাকা থেকে সামান্য কম, এটি এখনও খাতের একটি বড় অংশ। দেশের ৩৫টি জীবন বিমা কোম্পানি এই আয় করেছে।
- সাধারণ বিমা: অন্যদিকে, সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে এর পরিমাণ ছিল ৫,৯৮৩ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬,৫০২ কোটি টাকা।
জিডিপিতে বিমার অবদানঃ
প্রিমিয়াম আয় বৃদ্ধি পেলেও, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বিমা খাতের অবদান এখনও বেশ সীমিত। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা (BER) ২০২৪ অনুসারে, জিডিপিতে বিমা খাতের অবদান মাত্র ০.২৫%। এই হারটি অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বেশ কম। জীবন বিমা খাতের অনুপ্রবেশের হার জিডিপির ০.৪% এর সামান্য উপরে, যা গত এক দশকে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমা বিষয়ে জনসচেতনতার অভাব, আস্থার সংকট এবং নতুন ও উদ্ভাবনী পণ্যের অভাব এই খাতে জিডিপিতে কম অবদানের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা উদ্যোগ এবং ব্যাংকাসুরেন্সের মতো নতুন সেবা চালুর ফলে ভবিষ্যতে এই খাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রিমিয়াম আয় জিডিপির অবদান রাখে যথাক্রমেঃ যুক্ত্ররোষ্ট্র-৪০.২৬%, চীন-১০.৪৩%, যুক্তরাজ্য-৫.৩৮, জাপান-৮.১%, হংকং- ১১.৪%, ভারত-৪.১% সিঙ্গাপুর-৭%, যুক্তরাজ্য৫.৩৮, জার্মানি-৪.১১, ফ্রান্স-৩.৬৮%, দক্ষিণ কোরিয়া-৩.০৮%, ইতালি-২.৫৮%, কানাডা-২.২৮%, তাইওয়ান- ১.৮%,
Bangladesh: 0.46% in 2022, India: 4.2% in 2021, Nepal: 3.57% in 2022, Sri Lanka: 1.39% in 2022, Vietnam: 3.38% in 2022, Pakistan: 0.91% in 2022
একবার চিন্তা করুনতো বাংলাদেশের অবস্থান এত নিম্ন কেন? কেন বাংলাদেশ এত পিছিয়ে? অথচ বাংলাদেশ অর্থনীতির র্যাংকিংয়ে বিশ্বের ৩৫ তম অর্থনিতির দেশ। এই খাতটির কিন্তু উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বীমা খাতটি পিছিয়ে আছে।
উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়সমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলঃ
বীমা খাতের বিকাশে মূল বাধাগুলোকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
১. দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা: বীমা খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার অভাব, যার পেছনে মূল কারণ দুর্নীতি।
- বীমা দাবি পরিশোধে টালবাহানা: সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের বৈধ দাবি সময়মতো পরিশোধ করে না। অনেক সময় অন্যায্যভাবে দাবি বাতিল করে দেওয়া হয়, যা গ্রাহকদের চরমভাবে হয়রানি করে এবং বীমা বিমুখ করে তোলে।
- এজেন্টদের প্রতারণা: অনেক এজেন্ট পলিসির সঠিক তথ্য গোপন করে বা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে। প্রথম বছরের প্রিমিয়াম পাওয়ার পর আর যোগাযোগ না রাখা বা অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনাও ঘটে।
- অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি: কিছু কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে গ্রাহকের টাকা ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ, অর্থ পাচার এবং ভুয়া বিনিয়োগ দেখিয়ে তহবিল আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দাবি পরিশোধের সক্ষমতা হারায়।
২. রাষ্ট্রীয় নীতি ও নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা
কিছু নীতিগত সীমাবদ্ধতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা এই খাতের সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
- দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি: বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA)-এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব রয়েছে। আইন লঙ্ঘনকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা এবং তদারকির অভাবে পুরো খাতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।
- সচেতনতার অভাব: বীমার প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে তেমন কোনো জোরালো উদ্যোগ নেই।
- সেকেলে আইন ও নীতির অভাব: বর্তমান বীমা আইন ও নীতিগুলো আধুনিক সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়। নতুন ও উদ্ভাবনী বীমা পণ্য (যেমন: স্বাস্থ্য বীমা, কৃষি বীমা) চালুর ক্ষেত্রে নীতিগত সহায়তার অভাব রয়েছে।
- অদক্ষ জনবল: বীমা খাতে এখনো দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে গ্রাহকসেবার মান অত্যন্ত নিম্ন।
উত্তরণের পথ
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে এবং বীমা খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরি:
- নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করা: IDRA-কে আরও ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দিতে হবে, যাতে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত কোম্পানির বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।
- ডিজিটালাইজেশন ও স্বচ্ছতা: বীমা দাবি দাখিল ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করতে হবে। এটি স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং দুর্নীতি কমাবে।
- আইন সংশোধন: গ্রাহকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান বীমা আইন সংশোধন ও আধুনিকায়ন করতে হবে।
- সচেতনতামূলক প্রচারণা: বীমার গুরুত্ব বোঝাতে সরকারি উদ্যোগে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।
- বাধ্যতামূলক বীমা চালু: নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে (যেমন: স্বাস্থ্য, যানবাহনের তৃতীয় পক্ষ) বীমা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
- রাষ্ট্রীয় ভুল বীমা ষ্ট্যম্প প্রয়োগ নীতি প্রত্যাহার করতে হবে।
- ব্যাংক ইন্স্যুরেন্স এজেন্ট ছাড়া বাকি সকল বীমা কোম্পানির এজেন্ট কমিশন বন্ধ করতে হবে।
এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে এবং এটি দেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
==বীমা গবেষক, বীমা লেখক এবং কলামিষ্ট==