সাহানা আক্তার: মানি লন্ডারিং হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বা সম্পদকে (কালো টাকা) বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে বৈধ সম্পদে (সাদা টাকা) রূপান্তর করা হয়। এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থের উৎস গোপন করা, যাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা অন্য কেউ এর আসল উৎস খুঁজে না পায়।
সহজ কথায়, অপরাধমূলক কার্যক্রম যেমন দুর্নীতি, ঘুষ, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, জালিয়াতি, বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে পাওয়া অর্থকে এমনভাবে বৈধ অর্থনীতির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়, যাতে মনে হয় এটি কোনো বৈধ ব্যবসা বা বিনিয়োগ থেকে এসেছে।
মানি লন্ডারিং সাধারণত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
১. প্লেসমেন্ট (Placement): অবৈধভাবে অর্জিত নগদ অর্থকে আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করানো হয়। যেমন, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছোট ছোট অঙ্কে টাকা জমা করা বা কোনো লাভজনক ব্যবসায় বিনিয়োগ করা।
২. লেয়ারিং (Layering): এই ধাপে অর্থের উৎস গোপন করার জন্য বিভিন্ন জটিল লেনদেন ও হিসাবের জাল তৈরি করা হয়। যেমন, একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বারবার টাকা স্থানান্তর করা, বিভিন্ন দেশে ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে লেনদেন করা বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা।
৩. ইন্টিগ্রেশন (Integration): এই ধাপে, লন্ডারিং করা অর্থ বৈধ অর্থনীতির সঙ্গে পুরোপুরি মিশে যায়। এই অর্থ দিয়ে সম্পত্তি, গাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা অন্য যেকোনো সম্পদ কেনা হয়, যা থেকে ভবিষ্যতে বৈধ আয় দেখানো যায়।
মানি লন্ডারিং এর কয়েকটি উদাহরণ
১. হুন্ডি: এটি মানি লন্ডারিং এর একটি প্রচলিত পদ্ধতি। এক্ষেত্রে, একজন ব্যক্তি বিদেশে কোনো হুন্ডি এজেন্টের কাছে অবৈধ টাকা জমা দেয়। সেই এজেন্ট তার স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে সেই একই পরিমাণ টাকা দেশের নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে পৌঁছে দেয়। এতে টাকাটি কোনো ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার না করেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হয় এবং এর উৎস গোপন থাকে।
২. আন্ডার-ইনভয়েসিং ও ওভার-ইনভয়েসিং:
আন্ডার-ইনভয়েসিং: আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যের আসল দামের চেয়ে কম মূল্য উল্লেখ করা হয়। এতে আমদানিকারককে কম শুল্ক দিতে হয় এবং বাকি অর্থ অবৈধ পথে বিদেশে পাচার করা যায়।
ওভার-ইনভয়েসিং: রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের আসল দামের চেয়ে বেশি মূল্য দেখানো হয়। এতে বিদেশি ক্রেতা বেশি অর্থ পাঠায়, যা থেকে অতিরিক্ত অর্থ দেশে প্রবেশ করে এবং এর উৎস গোপন থাকে।
৩. ভুয়া কোম্পানি বা শেল কোম্পানি ব্যবহার: অপরাধীরা এমন কিছু কোম্পানি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করে, যার বাস্তবে কোনো কার্যক্রম নেই (শেল কোম্পানি)। এই কোম্পানিগুলোর নামে ভুয়া লেনদেন দেখানো হয়, যা ব্যবহার করে অবৈধ টাকা বৈধ টাকায় রূপান্তরিত হয়। যেমন, একটি ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে একটি সেবা বা পণ্য বিক্রির চুক্তি দেখিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করা।
৪. ক্যাসিনো ও জুয়ার ব্যবহার: অবৈধ টাকা বৈধ করার জন্য ক্যাসিনো একটি সহজ মাধ্যম। একজন ব্যক্তি অবৈধ টাকা দিয়ে ক্যাসিনোর চিপস কেনে এবং পরে সামান্য জুয়া খেলে সেই চিপসগুলো বৈধ আয়ের উৎস হিসেবে টাকায় রূপান্তরিত করে।
৫. রিয়েল এস্টেট বা সম্পত্তি কেনাবেচা: অবৈধ অর্থে কেনা সম্পত্তি কয়েকবার হাত বদল করা হয়। প্রতিবার নতুন মালিকের কাছে বিক্রি করার সময় দাম বাড়িয়ে দেখানো হয়। এতে সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং অবৈধ অর্থের উৎস সহজেই গোপন করা যায়। শেষ পর্যন্ত, যখন সম্পত্তিটি বিক্রি করা হয়, তখন তার থেকে প্রাপ্ত অর্থকে বৈধ আয় হিসেবে দেখানো হয়।
(ফ) ‘‘মানিলন্ডারিং’’ অর্থ—
(অ) নিম্নবর্ণিত উদ্দেশ্যে অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত সম্পত্তি জ্ঞাতসারে স্থানান্তর বা রূপান্তর বা হস্তান্তরঃ
(১) অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ প্রকৃতি, উৎস, অবস্থান, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ গোপন বা ছদ্মাবৃত্ত করা; অথবা
(২) সম্পৃক্ত অপরাধ সংগঠনে জড়িত কোন ব্যক্তিকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ হইতে রক্ষার উদ্দেশ্যে সহায়তা করা;
(আ) বৈধ বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বা সম্পত্তি নিয়ম বর্হিভূতভাবে বিদেশে পাচার করা;
(ই) জ্ঞাতসারে অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করিবার উদ্দেশ্যে উহার হস্তান্তর, বিদেশে প্রেরণ বা বিদেশ হইতে বাংলাদেশে প্রেরণ বা আনয়ন করা;
(ঈ) কোন আর্থিক লেনদেন এইরূপভাবে সম্পন্ন করা বা সম্পন্ন করিবার চেষ্টা করা যাহাতে এই আইনের অধীন উহা রিপোর্ট করিবার প্রয়োজন হইবে না;
(উ) সম্পৃক্ত অপরাধ সংঘটনে প্ররোচিত করা বা সহায়তা করিবার অভিপ্রায়ে কোন বৈধ বা অবৈধ সম্পত্তির রূপান্তর বা স্থানান্তর বা হস্তান্তর করা;
(ঊ) সম্পৃক্ত অপরাধ হইতে অর্জিত জানা সত্ত্বেও এই ধরণের সম্পত্তি গ্রহণ, দখলে নেওয়া বা ভোগ করা;
(ঋ) এইরূপ কোন কার্য করা যাহার দ্বারা অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করা হয়;
(এ) উপরে বর্ণিত যে কোন অপরাধ সংঘটনে অংশগ্রহণ, সম্পৃক্ত থাকা, অপরাধ সংঘটনে ষড়যন্ত্র করা, সংঘটনের প্রচেষ্টা অথবা সহায়তা করা, প্ররোচিত করা বা পরামর্শ প্রদান করা;
(ব) ‘‘রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা’’ অর্থ—
(অ) ব্যাংক;
(আ) আর্থিক প্রতিষ্ঠান;
(ই) বীমাকারী;
(ঈ) মানি চেঞ্জার;
(উ) অর্থ অথবা অর্থমূল্য প্রেরণকারী বা স্থানান্তরকারী যে কোন কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠান;
(ঊ) বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতিক্রমে ব্যবসা পরিচালনাকারী অন্য কোন প্রতিষ্ঠান;
(ঋ) (১) স্টক ডিলার ও স্টক ব্রোকার,
‘‘সম্পৃক্ত অপরাধ (Predicate offence) ’’ অর্থ নিম্নে উল্লিখিত অপরাধ, যাহা দেশে বা দেশের বাহিরে সংঘটনের মাধ্যমে অর্জিত কোন অর্থ বা সম্পদ লন্ডারিং করা বা করিবার চেষ্টা করা, যথাঃ—
(১) দুর্নীতি ও ঘুষ;
(২) মুদ্রা জালকরণ;
(৩) দলিল দস্তাবেজ জালকরণ;
(৪) চাঁদাবাজি;
(৫) প্রতারণা;
(৬) জালিয়াতি;
(৭) অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা;
(৮) অবৈধ মাদক ও নেশা জাতীয় দ্রব্যের ব্যবসা;
(৯) চোরাই ও অন্যান্য দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা;
(১০) অপহরণ, অবৈধভাবে আটকাইয়া রাখা ও পণবন্দী করা;
(১১) খুন, মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি;
(১২) নারী ও শিশু পাচার;
(১৩) চোরাকারবার ;
(১৪) দেশী ও বিদেশী মুদ্রা পাচার;
(১৫) চুরি বা ডাকাতি বা দস্যুতা বা জলদস্যুতা বা বিমান দস্যুতা;
4[(১৬) মানব পাচার বা কোন ব্যক্তিকে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মিথ্যা আশ্বাস প্রদান করিয়া কোন অর্থ বা মূল্যবান দ্রব্য গ্রহণ করা বা করিবার চেষ্টা;]
(১৭) যৌতুক;
(১৮) চোরাচালানী ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধ;
(১৯) কর সংক্রান্ত অপরাধ;
(২০) মেধাস্বত্ব লংঘন;
(২১) সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থ যোগান;
(২২) ভেজাল বা স্বত্ব লংঘন করে পণ্য উৎপাদন;
(২৩) পরিবেশগত অপরাধ;
(২৪) যৌন নিপীড়ন (Sexual Exploitation) ;
(২৫) পুঁজি বাজার সম্পর্কিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে তাহার কাজে লাগাইয়া শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে বাজার সুবিধা গ্রহণ ও ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার লক্ষ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা (Insider Trading & Market Manipulation) ;
(২৬) সংঘবদ্ধ অপরাধ (Organised Crime) বা সংঘবদ্ধ অপরাধী দলে অংশগ্রহণ;
(২৭) ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায়; এবং
(২৮) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে 5[বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট] কর্তৃক সরকারের অনুমোদনক্রমে গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষিত অন্য যে কোন সম্পৃক্ত অপরাধ;
(ষ) ‘‘স্পেশাল জজ’’ অর্থ Criminal Law (Amendment) Act, 1958 (Act No. XL of 1958) এর section 3 এর অধীন নিযুক্ত
Special Judge ;
(স) (১) ‘‘স্টক ডিলার ও স্টক ব্রোকার’’ অর্থ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক ডিলার, স্টক ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০ এর যথাক্রমে বিধি ২ (ঝ) ও ২ (ঞ) এ সংজ্ঞায়িত প্রতিষ্ঠান;
(২) ‘‘পোর্টফোলিও ম্যানেজার ও মার্চেন্ট ব্যাংকার’’ অর্থ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার) বিধিমালা, ১৯৯৬ এর যথাক্রমে বিধি ২ (চ) ও ২ (ঞ) এ সংজ্ঞায়িত প্রতিষ্ঠান;
(৩) ‘‘সিকিউরিটি কাস্টডিয়ান’’ অর্থ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (সিকিউরিটি কাস্টডিয়াল সেবা) বিধিমালা, ২০০৩ এর বিধি ২ (ঞ) এ সংজ্ঞায়িত প্রতিষ্ঠান;
(৪) ‘‘সম্পদ ব্যবস্থাপক’’ অর্থ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১ এর বিধি ২ (ধ) এ সংজ্ঞায়িত প্রতিষ্ঠান;
(হ) ‘‘হাইকোর্ট বিভাগ’’ অর্থ বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ।
মানিলন্ডারিং অপরাধ ও দণ্ডঃ
৪। (১) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, মানিলন্ডারিং একটি অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে।
(২) কোন ব্যক্তি মানিলন্ডারিং অপরাধ করিলে বা মানিলন্ডারিং অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে তিনি অন্যূন ৪ (চার) বৎসর এবং অনধিক ১২ (বার) বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুন মূল্যের সমপরিমাণ বা ১০ (দশ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত, যাহা অধিক, অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন 7[ :
তবে শর্ত থাকে যে, আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত সময়সীমার মধ্যে অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হইলে আদালত অপরিশোধিত অর্থদণ্ডের পরিমাণ বিবেচনায় অতিরিক্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে।]
(৩) আদালত কোন অর্থদণ্ড বা দণ্ডের অতিরিক্ত হিসাবে দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে যাহা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানিলন্ডারিং বা কোন সম্পৃক্ত অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত বা সংশ্লিষ্ট।
8[ (৪) কোন সত্তা এই আইনের অধীন কোন অপরাধ সংঘটন করিলে বা অপরাধ সংঘঠনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে ধারা ২৭ এর বিধান সাপেক্ষে, উপ-ধারা (২) এর বিধান অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে এবং অপরাধের সহিত সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির মূল্যের অন্যূন দ্বিগুণ অথবা ২০ (বিশ) লক্ষ টাকা, যাহা অধিক হয়, অর্থদন্ড প্রদান করা যাইবে এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিলযোগ্য হইবে:
তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত সত্তা আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত সময়সীমার মধ্যে অর্থদন্ড পরিশোধে ব্যর্থ হইলে আদালত অপরিশোধিত অর্থদন্ডের পরিমাণ বিবেচনায় সত্তার মালিক, চেয়ারম্যান বা পরিচালক যে নামেই অভিহিত করা হউক না কেন, তাহার বিরুদ্ধে কারাদন্ডে দন্ডিত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে।] (৫) সম্পৃক্ত অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হওয়া মানিলন্ডারিং এর কারণে অভিযুক্ত বা দণ্ড প্রদানের পূর্বশর্ত হইবে না।