ছোট ছোট উদ্দোগক্তারা বিভিন্ন জটিলতার কারণে এগুতে পারছে না

মোঃ মানসুর আলম সিকদার, এম.বি এ, এল এল.বি: ছোট ছোট উদ্দোগক্তারা আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জটিলতার কারণে এগুতে পারছে না যেমন: টেবিলে টেবিলে ঘুষ, ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট-ট্যাক্স রেজিস্ট্রেশন, পরিবেশ ছাড়পত্র, বা বিএসটিআই (BSTI) অনুমোদনের প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত ধীরগতির এবং জটিল ইত্যাদি কারণে তারা এগুতে পারছে না।

ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য এই আমলাতান্ত্রিক দেয়ালগুলো এক একটা অদৃশ্য পাহাড়ের মতো। বড় বড় করপোরেট কোম্পানিগুলোর জন্য যেখানে আলাদা ‘লিপগ্যাল টিম’ বা লিয়াজোঁ অফিসার থাকে এই কাগজপত্রের পেছনে দৌড়ানোর জন্য, সেখানে একজন ছোট উদ্যোক্তাকে নিজেই পণ্য বানাতে হয়, নিজেই ডেলিভারি দিতে হয়, আবার নিজেই সরকারি অফিসের টেবিলে টেবিলে ঘুরতে হয়। এগুলোর প্রতি সরকারের নজর দেয়া উচিত।

এই জটিলতাগুলো যেভাবে একজন উদ্যোক্তার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়:

১. “টেবিলে টেবিলে ঘুষ” এবং অতিরিক্ত খরচ

কাগজে-কলমে একটা লাইসেন্স বা সার্টিফিকেটের ফি হয়তো খুব বেশি না। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে পাঠাতে, স্বাক্ষর করাতে পদে পদে “স্পিড মানি” বা ঘুষ দিতে হয়। একজন নতুন উদ্যোক্তা, যার পুঁজিই হয়তো মাত্র ১ বা ২ লাখ টাকা, তার বাজেটের একটা বড় অংশ যদি শুরুতেই এই অনৈতিক খাতে চলে যায়, তবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়ে।

২. ট্রেড লাইসেন্সের বৈষম্য ও নবায়ন হয়রানি

ব্যবসার প্রথম ধাপই হলো ট্রেড লাইসেন্স।

  • ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে কমার্শিয়াল স্পেস বা বাণিজ্যিক ঠিকানার চুক্তিপত্র ছাড়া লাইসেন্স পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু একজন ছোট উদ্যোক্তা বা অনলাইন সেলার তো শুরুতেই দামি কমার্শিয়াল স্পেস ভাড়া নিতে পারেন না।
  • এর ওপর প্রতি বছর এই লাইসেন্স নবায়ন করার ঝামেলা তো আছেই।

৩. ভ্যাট-ট্যাক্স (NBR) রেজিস্ট্রেশনের আতঙ্ক

ভ্যাট এবং ট্যাক্সের নিয়মকানুনগুলো এতই জটিল যে সাধারণ একজন মানুষের পক্ষে তা বোঝা কঠিন।

  • হয়রানি: অনেক সময় দেখা যায়, সঠিকভাবে ট্যাক্স ফাইল জমা দেওয়ার পরও এনবিআর (NBR) থেকে অহেতুক অডিট বা বাড়তি ট্যাক্সের দাবি করে বসা হয়।
  • কনসালটেন্ট ফি: এই জটিলতা এড়াতে আইনজীবী বা কনসালটেন্ট নিয়োগ করতে হয়, যা ছোট ব্যবসার জন্য বাড়তি খরচের বোঝা।

৪. বিএসটিআই (BSTI) ও পরিবেশ ছাড়পত্রের দীর্ঘসূত্রতা

খাদ্য, প্রসাধনী বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য BSTI বা পরিবেশ ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক।

  • সময়ক্ষেপণ: একটা ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট বা অনুমোদন আসতে মাসের পর মাস, এমনকি বছরও পার হয়ে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে উদ্যোক্তার পুঁজি আটকে থাকে, ব্যবসার আইডিয়া বা পণ্যের ট্রেন্ড হারিয়ে যায়।
  • শত শত শর্ত: ছোট ফ্যাক্টরি বা কুটির শিল্পের পক্ষে বড় কারখানার মতো সব শর্ত পূরণ করা অনেক সময়ই অসম্ভব হয়। অথচ নীতিমালায় ছোট ও বড় শিল্পের জন্য আলাদা সহজ কোনো নিয়ম রাখা হয়নি।

এর ফলে দেশের কী ক্ষতি হচ্ছে?

  • উদ্যোগের অকাল মৃত্যু: বহু চমৎকার এবং সম্ভাবনাময় আইডিয়া শুধু এই কাগজপত্রের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে আলোর মুখ দেখার আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
  • অনানুষ্ঠানিক (Informal) ব্যবসার বৃদ্ধি: আইনি জটিলতার ভয়ে অনেকেই লাইসেন্স ছাড়াই লুকিয়ে ব্যবসা করছেন। এর ফলে তারা যেমন ব্যাংক ঋণ পাচ্ছেন না, তেমনি সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে।

বাস্তবতা হলো: যতক্ষণ না এই লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াগুলো পুরোপুরি ডিজিটাল, মানুষের স্পর্শহীন (Faceless) এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের (One-Stop Service) আওতায় আনা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুখে “উদ্যোক্তা বান্ধব বাংলাদেশ” বলা হলেও বাস্তবে ছোটদের জন্য পথটা এমনই কণ্টকাকীর্ণ থাকবে।

ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের (SMEs) টিকিয়ে রাখতে হলে যা করতে হবেঃ বাংলাদেশে ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের (SMEs) টিকিয়ে রাখা এবং তাদের বিকাশের পথ সহজ করতে হলে কাগজের নীতিমালার বাইরে এসে একদম মাঠপর্যায়ে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। নিচে প্রধান করণীয়গুলো তুলে ধরা হলো:

১. লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া ‘ওয়ান-স্টপ’ এবং ডিজিটাল করা

সবচেয়ে বড় সংস্কার দরকার সরকারি লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায়।

  • অনলাইন ওয়ান-স্টপ সার্ভিস: ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট-ট্যাক্স রেজিস্ট্রেশন, বিএসটিআই (BSTI) বা পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আলাদা আলাদা অফিসে না দৌড়ে, একটিমাত্র কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে যেন সব আবেদন করা যায়।
  • ফেসলেস (Faceless) অডিট: সরকারি কর্মকর্তা ও উদ্যোক্তার সরাসরি যোগাযোগ যত কমবে, “টেবিলে টেবিলে ঘুষ” বা হয়রানি তত কমে আসবে।

২. ছোট ব্যবসার জন্য আলাদা “স্মার্ট” নীতিমালা

বড় করপোরেট আর ৫ লাখ টাকার পুঁজি নিয়ে শুরু করা ছোট উদ্যোক্তাকে একই দাঁড়িপাল্লায় মাপা বন্ধ করতে হবে।

  • ক্যাটাগরিভিত্তিক ছাড়: ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের (Micro & Cottage) জন্য বিএসটিআই বা পরিবেশ ছাড়পত্রের শর্ত ও ফি অনেক সহজ এবং নামমাত্র করা উচিত।
  • ট্যাক্স হলিডে: নতুন বা ছোট উদ্যোক্তাদের প্রথম ৩ থেকে ৫ বছর কর অবকাশ (Tax Holiday) বা ভ্যাট-ট্যাক্স থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে, যাতে তারা আগে পায়ে দাঁড়াতে পারে।

৩. জামানতবিহীন ও সহজ শর্তে ঋণ (Collateral-Free Loan)

ব্যাংকিং ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার।

  • ক্যাশ-ফ্লো ভিত্তিক ঋণ: স্থাবর সম্পত্তি বা জমি বন্ধক রাখার নিয়ম বাদ দিয়ে ব্যবসার লেনদেন বা ক্যাশ-ফ্লো (Cash Flow) দেখে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ডিজিটাল মাইক্রো-লোন: মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ) বা ফিনটেক অ্যাপের মাধ্যমে ছোট অঙ্কের ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করা দরকার।

৪. ইনকিউবেশন ও মেন্টরশিপ সেন্টার

শুধু টাকা বা লাইসেন্স দিলেই ব্যবসা টেকে না, সঠিক দিকনির্দেশনাও লাগে।

  • সরকারি উদ্যোগে প্রতিটি জেলা বা উপজেলায় ‘উদ্যোক্তা সহায়তা কেন্দ্র’ খোলা উচিত। সেখান থেকে হিসাবরক্ষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, এবং লিগ্যাল প্রসেস ফ্রিতে বা নামমাত্র মূল্যে শেখানো হবে।

৫. বাজার সংযোগ (Market Access) তৈরি করা

ছোট উদ্যোক্তারা পণ্য বানিয়ে যেন বড় বড় কোম্পানির কাছে হেরে না যান, সেজন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দরকার।

  • কোটা সিস্টেম: সরকারি কেনাকাটায় (যেমন: অফিসের আসবাবপত্র, স্টেশনারি বা অন্যান্য লজিস্টিকস) একটা নির্দিষ্ট অংশ (ধরা যাক ২০%) ছোট স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে কেনা বাধ্যতামূলক করা।
  • সরাসরি বাজার: মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলা, যাতে উৎপাদক সরাসরি রিটেইলার বা কাস্টমারের কাছে পৌঁছাতে পারেন।

৬. নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটা বড় অংশ নারী, যারা ঘরে বসে বা অনলাইনে কাজ করছেন। তাদের জন্য ট্রেড লাইসেন্সের প্রক্রিয়া আরও শিথিল করা এবং কমার্শিয়াল স্পেসের বাধ্যবাধকতা পুরোপুরি তুলে দেওয়া উচিত।

মূল কথা: ছোট উদ্যোক্তাদের আমরা দয়া করছি না, বরং তারা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি (Engine of Growth)। তাদের বাঁচাতে হলে আমলাতন্ত্রের মানসিকতা “নিয়ন্ত্রণ করা” থেকে বদলে “সহায়তা করা”য় রূপান্তর করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *