মোঃ মানসুর আলম সিকদার, এম.বি.এ., এল এল. বিঃ মাদকাসক্তি এবং অপরাধ প্রবণতার (যেমন চুরি, ছিনতাই বা জুয়া) মধ্যে একটি গভীর ও জটিল সম্পর্ক রয়েছে। সমাজবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই প্রবণতার পেছনে বেশ কিছু জোরালো যুক্তি ও কারণ কাজ করে।
নিচে আপনার প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান যুক্তিগুলো তুলে ধরা হলো:
১. অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও তাৎক্ষণিক চাহিদা
মাদকাসক্তির ফলে একজন ব্যক্তির মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যায়। যখন মাদকের নেশা তীব্র হয়, তখন সেটি সংগ্রহের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন পড়ে। আসক্ত ব্যক্তির যদি বৈধ আয়ের উৎস না থাকে বা সেই আয় নেশার খরচ মেটাতে অপর্যাপ্ত হয়, তখন তারা চুরি বা ছিনতাইয়ের মতো অপরাধকে সহজ পথ হিসেবে বেছে নেয়।
২. মস্তিষ্কের ডোপামিন ও জুয়ার নেশা
মাদক এবং জুয়া—উভয়ই মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ বা আনন্দদায়ক অনুভূতি তৈরির কেন্দ্রগুলোকে উদ্দীপিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে:
- মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা (Risk-taking behavior) বাড়িয়ে ফেলে।
- জুয়া খেলার মাধ্যমে দ্রুত টাকা পাওয়ার আশায় তারা এই পথে পা বাড়ায়, যা মূলত তাদের নেশার খরচ জোগানোর একটি মরিয়া চেষ্টা।
৩. বিচারবুদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণ হারানো
মাদক সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ (Prefrontal Cortex)-এ আঘাত করে, যা আমাদের সঠিক-ভুল বিচার করতে সাহায্য করে। এর ফলে:
- ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পায়।
- সামাজিক নৈতিকতা বা লোকলজ্জার চেয়ে নেশার দ্রব্য পাওয়াটাই তাদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।
৪. মাদকের ব্যবসায়িক চক্র (Drug Peddling)
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন আসক্ত ব্যক্তি নিজের নেশার খরচ জোগাতে নিজেই মাদক কেনাবেচার সাথে জড়িয়ে পড়ে। বড় মাদক ব্যবসায়ীরা প্রায়ই আসক্ত ব্যক্তিদের ‘কুরিয়ার’ বা খুচরা বিক্রেতা হিসেবে ব্যবহার করে, যা তাদের অপরাধ জগতে আরও গভীরে নিয়ে যায়। তা ছাড়াও এর সাথে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলার সাথে নিয়োজিত ব্যক্তিরা জড়িত বলে সূত্র মতে জানতে পারছি। এমন কথা পর্যন্ত শুনেছি যে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনি অপরাধী চক্রের মাধ্যমে বাদকের ব্যবসা করে। যদি ঐ অপরাধি মাদক বিক্রি না করে তবে তাকে বিভিন্ন মামলায় অথবা বন্দুক যুদ্ধের নামে হত্যা পর্যন্ত করত।
৫. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা ধীরে ধীরে পরিবার ও সুস্থ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই একাকীত্ব এবং কর্মসংস্থানের অভাব তাদের অপরাধী চক্রের সাথে মিশতে বাধ্য করে। যেখানে চুরি, ছিনতাই এবং জুয়া খেলাকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হয়।
সারকথা: মাদকাসক্তি কেবল একটি শারীরিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। আসক্ত ব্যক্তিরা মূলত পরিস্থিতির শিকার হয়ে বা মস্তিষ্কের রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে এই অপরাধগুলোতে জড়িয়ে পড়ে। তাই তাদের কেবল অপরাধী হিসেবে না দেখে, চিকিৎসার মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। তবে যদি মাদকাসক্তরা ভালো না হয় সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বাধ্যতামূলকভাবে, দেশ এবং জনগনের সার্থে মাদক নির্মূলে 0% টলারেন্স মনোভাব দেখাতে হবে।