“ভয়াল মাদকে ছয়লাব বাংলাদেশ”

মোঃ মানসুর আলম সিকদার, এম.বি.এ, এল এল. বি: বাংলাদেশে মাদক পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র সত্যিই উদ্বেগজনক। এটি কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

. মাদকের সহজলভ্যতা বৈচিত্র্য: ​আগে মাদক বলতে মূলত ফেনসিডিল বা গাঁজাকে বোঝানো হতো, কিন্তু এখন সিনথেটিক বা রাসায়নিক মাদকের বিস্তার ঘটেছে ভয়াবহভাবে।

ইয়াবা আইস: মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবা এখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। অতি সম্প্রতি ‘আইস’ বা ক্রিস্টাল মেথ-এর মতো অত্যন্ত শক্তিশালী ও ব্যয়বহুল মাদকের অনুপ্রবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

নতুন ধরনের মাদক: এলএসডি (LSD), ডিওবি (DOB) এবং কুশ-এর মতো দামী ও বিপজ্জনক মাদকের বিস্তার ঘটছে মূলত উচ্চবিত্ত তরুণদের মাঝে।

. ভৌগোলিক অবস্থান পাচারপথ: ​বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ (মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস) এবং ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ (পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান) এর মাঝামাঝি অবস্থানে থাকায় আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার জোয়ার থামানো যাচ্ছে না।

. টার্গেট গ্রুপ: যুবসমাজ: ​মাদকের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে দেশের তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থী।

বেকারত্ব হতাশা: কর্মসংস্থানের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক তরুণকে মাদকের পথে ঠেলে দিচ্ছে।

কৌতূহল পিয়ার প্রেশার: বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে বা নিছক কৌতূহল থেকে শুরু করে অনেকেই আসক্ত হয়ে পড়ছে।

. সামাজিক অর্থনৈতিক প্রভাব: ​পারিবারিক অশান্তি: মাদকাসক্তির কারণে পরিবারগুলোতে কলহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং পারিবারিক সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

অপরাধ বৃদ্ধি: মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে চুরি, ছিনতাই, এমনকি খুনের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে আসক্তরা।

অর্থনৈতিক ক্ষতি: প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে মাদকের মাধ্যমে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি।

. চ্যালেঞ্জসমূহ: ​সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে জটিলতা: দুর্গম সীমান্ত এলাকা দিয়ে চোরাচালান বন্ধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ​আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের সংশ্লিষ্টতা: বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়, যা নির্মূল প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।

পুনর্বাসনের অভাব: আসক্তদের সুস্থ করার জন্য মানসম্মত ও সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

বিভিন্ন সরকারিবেসরকারি সংস্থা এবং গবেষণার তথ্য অনুযায়ী একটি আনুমানিক হিসাব পাওয়া যায়মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (DNC), বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী:

. বার্ষিক কেনাবেচার পরিমাণ: বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার কোটি থেকে লাখ কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা হয়। ২০২৪ সালে একটি সেমিনারে জানানো হয় যে, দেশে মাদক সেবনের পেছনে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে, যা দেশের জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ।

. অর্থ পাচারের তথ্য: জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (UNCTAD)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় হাজার কোটি টাকা (৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিদেশে পাচার হয়ে যায়। মাদক কেনাবেচার মাধ্যমে অর্থ পাচারের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৫ম

. মাদকসেবীর সংখ্যা দৈনিক ব্যয়ঃ

  • মাদকসেবীর সংখ্যা: সাম্প্রতিক তথ্য (২০২৫) অনুযায়ী, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮৩ লাখ থেকে কোটি। যদিও কিছু বেসরকারি সংস্থার মতে এই সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি।
  • দৈনিক ব্যয়: গড়ে একজন মাদকসেবী দিনে অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মাদক সেবন করেন। এই হিসেবে মাদকাসক্তরা দিনে কোটি কোটি টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করছেন।

. জনপ্রিয় মাদকের ধরনঃ

বাংলাদেশে কেনাবেচা হওয়া মাদকের মধ্যে শীর্ষ তালিকায় রয়েছে:

  • ইয়াবা: সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয়।
  • আইস (ক্রিস্টাল মেথ): সাম্প্রতিক সময়ে এর অনুপ্রবেশ বেড়েছে।
  • গাঁজা হেরোইন: প্রান্তিক পর্যায়ে এর ব্যাপক বিস্তার রয়েছে।
  • ফেনসিডিল ইনজেকশন জাতীয় মাদক

সারসংক্ষেপ: বাংলাদেশের বিশাল এই মাদকের বাজার মূলত ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ মাদকদ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল। এই বিশাল অংকের টাকা শুধু অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং সামাজিক অবক্ষয় ও অপরাধ বৃদ্ধির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদক কেবল একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না, বরং একটি প্রজন্মকে পঙ্গু করে দেয়। শুধু কঠোর আইন বা অভিযান দিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা, পরিবারের ভূমিকা এবং তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *