বিমা খাতের প্রসারে ‘মার্তৃ ভাষা’ হাইকোর্টের নির্দেশনা কতটুকু পরিপালন হচ্ছে?

মোঃ মানসুর আলম সিকদার, এম.বি. এ, এল এল. বিঃ হাইকোর্ট থেকে বিমা পলিসি বা বীমার নথিপত্র বাংলা ভাষায় করার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ বিভিন্ন সময়ে এসেছে। মূলত গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা এবং বিমা চুক্তির শর্তাবলি যেন সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য সূত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

.   হাইকোর্টের মূল নির্দেশনাঃ ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের বিভিন্ন সময়ে বিমা খাতের অনিয়ম ও গ্রাহক হয়রানি রোধে হাইকোর্ট মৌখিক ও লিখিত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, বিমা কোম্পানিগুলো যখন পলিসি ইস্যু করে, তখন সেগুলোর শর্তাবলি (Terms and Conditions) সাধারণত ইংরেজি এবং খুব ছোট অক্ষরে লেখা থাকে, যা সাধারণ গ্রাহকদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না।

২) আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী: বিমা পলিসির যাবতীয় শর্তাবলি সহজ এবং সাবলীল বাংলায় লিখতে হবে। শর্তের ভাষা এমন হতে হবে যা একজন সাধারণ মানুষ সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।

.   আইনি ভিত্তি সূত্র (Reference)

এই নির্দেশনার পেছনে প্রধানত দুটি প্রেক্ষাপট কাজ করেছে:

৩) রিট পিটিশন আদালতের রায়: বিমা খাতের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে দায়ের করা জনস্বার্থমূলক মামলার শুনানিতে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বিভিন্ন সময়ে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার এবং বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বিমা খাতের অনিয়ম নিয়ে শুনানিকালে এই নির্দেশনা প্রদান করেন।

৪) বিমা আইন, ২০১০ বিমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA): হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA) একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে বলা হয়েছে, জীবন বিমা ও সাধারণ বিমার পলিসি ফরম এবং গ্রাহকদের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র বাংলায় তৈরি করতে হবে।

৫) কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

ক. স্বচ্ছতা: অধিকাংশ বিমা গ্রাহক গ্রামের সাধারণ মানুষ। ইংরেজি টেকনিক্যাল শব্দ বুঝতে না পারার কারণে তারা প্রায়ই বিমা দাবির (Claim) সময় প্রতারিত হন।

খ. আইনি সুরক্ষা: বাংলায় নথি থাকলে গ্রাহক তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং বিমা কোম্পানি চাইলেই কোনো অস্পষ্ট অজুহাতে দাবি বাতিল করতে পারে না।

গ. বিমা আইনের সঠিক বাস্তবায়ন: বিমা আইন অনুযায়ী গ্রাহককে চুক্তির সকল শর্ত স্পষ্টভাবে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে।


৬) বর্তমান অবস্থা: আইডিআরএ-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন অনুমোদিত সকল বিমা পণ্যের (Insurance Products) ক্ষেত্রে এখন পলিসি ডকুমেন্টস বাংলায় প্রদান করা হচ্ছে। কোম্পানিগুলো তাদের বিদ্যমান পলিসিগুলোকেও পর্যায়ক্রমে বাংলায় অনুবাদ করে গ্রাহকদের সরবরাহ করছে। সংক্ষেপে সূত্র: ১. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ (২০২৩-২৪)। ২. বিমা আইন, ২০১০ (ধারা ১৫)। ৩. আইডিআরএ ‘বিমা গ্রাহক সুরক্ষা গাইডলাইন্স, ২০২৪’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিমা খাতের প্রসারে ভাষা একটি বিশাল অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের মাঝে বিমা সম্পর্কে যে আস্থার সংকট বা অস্পষ্টতা রয়েছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো তথ্যের সহজলভ্যতা না থাকা।

৭) সুনির্দিষ্ট সূত্র প্রেক্ষাপট নিচে তুলে ধরা হলো:

নির্দেশনার মূল সূত্র (Reference)

ক. উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ (২০২৩২০২৪): বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার এবং বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বিমা খাতের অনিয়ম ও হয়রানি নিয়ে শুনানিকালে এই নির্দেশনা দেন। আদালত বলেন, বিমা কোম্পানিগুলো পলিসির শর্তাবলি ইংরেজিতে এবং এত ছোট অক্ষরে লেখে যে, সাধারণ গ্রাহকরা তা বুঝতে পারেন না। ফলে পরবর্তীতে বিমা দাবি নিষ্পত্তির সময় কোম্পানিগুলো ওই অস্পষ্ট শর্তের দোহাই দিয়ে গ্রাহকদের হয়রানি করে।

খ.   বিমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA) এর নির্দেশনা: হাইকোর্টের মৌখিক ও লিখিত নির্দেশনার প্রেক্ষিতে বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা IDRA বিমা কোম্পানিগুলোর জন্য একটি গাইডলাইন ও প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, নতুন ইস্যুকৃত সকল বিমা পলিসির ফরম এবং শর্তাবলি সহজ বাংলায় হতে হবে।

গ.   বিমা গ্রাহক সুরক্ষা গাইডলাইন্স, ২০২৪: ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আইডিআরএ ‘বিমা গ্রাহক সুরক্ষা গাইডলাইন্স’ প্রকাশ করে, যেখানে গ্রাহকের স্বার্থে দলিলাদি সহজবোধ্য ভাষায় (বিশেষত বাংলায়) করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ঘ) আদালতের বক্তব্যের মূল নির্যাস:

বিমা চুক্তি একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, যার শর্ত উভয় পক্ষকে সমানভাবে বুঝতে হবে

শর্তাবলি ইংরেজিতে থাকায় দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ চুক্তির মারপ্যাঁচ বুঝতে পারেন না, যা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। বিমা কোম্পানিগুলোকে তাদের সেবার মান বাড়াতে এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলায় নথিপত্র প্রদান করতে হবে। এই ঐতিহাসিক নির্দেশনার ফলে বর্তমানে বিমা কোম্পানিগুলো তাদের জীবন বিমা ও সাধারণ বিমার পলিসিগুলো বাংলায় রূপান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে তবে সেটা পর্যাপ্ত না।

৮) বাংলাদেশে বিমা খাতে বাংলার প্রচলন কেন অপরিহার্য, তার কয়েকটি যৌক্তিক কারণ এবং এর ফলে কী পরিবর্তন আসতে পারে তা নিচে তুলে ধরা হলো:

. গ্রাহকের আস্থা স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণঃ বিমা একটি আইনি চুক্তি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রাহকরা যখন পলিসি কেনেন, তখন তারা ইংরেজি ভাষার মারপ্যাঁচে পড়ে শর্তগুলো পুরোপুরি বুঝতে পারেন না। পরবর্তীতে বিমা দাবি (Claim) নিষ্পত্তির সময় যখন কোনো টেকনিক্যাল ইংরেজি শব্দের দোহাই দিয়ে দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়, তখন গ্রাহক নিজেকে প্রতারিত মনে করেন। এটি পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নথিপত্র বাংলায় হলে গ্রাহক জানবেন তিনি কিসের জন্য টাকা দিচ্ছেন।

. বিমা সচেতনতা বৃদ্ধিঃ গ্রামাঞ্চলের কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা সাধারণ কর্মজীবী মানুষের কাছে বিমা সম্পর্কে জ্ঞান পৌঁছাতে হলে তাদের মায়ের ভাষাকেই মাধ্যম করতে হবে। বিমার প্রয়োজনীয়তা এবং এর ভবিষ্যৎ সুবিধাগুলো যদি বাংলায় সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায় (যেমন- ব্রোশিওর, লিফলেট বা ওয়েবসাইট), তবেই মানুষ এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।

. শিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিঃ বিমা খাতের একটি বড় অংশ হলো মাঠপর্যায়ের এজেন্টরা। অনেক এজেন্টও ইংরেজি পরিভাষাগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারেন না, ফলে তারা গ্রাহককে ভুল তথ্য দিয়ে বসেন। বাংলায় প্রশিক্ষণ এবং নথিপত্র থাকলে এজেন্টরা যেমন দক্ষ হবেন, তেমনি গ্রাহকরাও সঠিক তথ্য পাবেন।

. আইনি জটিলতা হ্রাসঃ হাইকোর্ট যে নির্দেশনাটি দিয়েছেন তার মূল উদ্দেশ্যই ছিল এটি। বিমা সংক্রান্ত মামলাগুলোতে দেখা যায়, চুক্তির অস্পষ্টতাই মূল বিরোধের কারণ। বাংলায় দলিল থাকলে আদালত এবং সাধারণ মানুষ উভয় পক্ষের জন্যই বিষয়টি সহজবোধ্য হবে।


৯) বিমা খাতকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:

বিমা খাতের বর্তমান চিত্র উন্নয়নের প্রয়োজনীয় ধাপগুলো নিচে একটি চার্টের মাধ্যমে দেখা যেতে পারে:

পদক্ষেপপ্রত্যাশিত ফলাফল
সহজ বাংলা অনুবাদচুক্তির শর্তাবলি সবার কাছে স্পষ্ট হবে।
ডিজিটাল সেবা বাংলায়মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে বাংলায় তথ্য থাকলে মানুষ সহজে ব্যবহার করবে।
বাংলায় প্রচার (Campaign)বিমা সম্পর্কে জনসচেতনতা ও আগ্রহ বাড়বে।
আইন প্রয়োগআইডিআরএ-এর নির্দেশনা কঠোরভাবে মানলে স্বচ্ছতা আসবে।

১০) বর্তমানে এই নির্দেশনা পরিপালনের চিত্রটি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

.   হাইকোর্টের মূল নির্দেশনা প্রেক্ষাপট: ২০১৪ সালে হাইকোর্ট একটি ঐতিহাসিক রুল জারি করে যেখানে বলা হয়, সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড, নামফলক এবং গণমাধ্যমে প্রচারিত বিজ্ঞাপন বাংলায় হতে হবে। পরবর্তীকালে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA) বিমা পলিসির শর্তাবলিও বাংলায় সহজবোধ্য করার তাগিদ দেয়।

. বর্তমান অবস্থা: কতটুকু পালিত হচ্ছে? বিমাখাতে এই নির্দেশনার প্রয়োগ মিশ্র। বিস্তারিত পরিস্থিতি নিচে দেওয়া হলো:

বিমা পলিসি বা চুক্তিপত্র: অধিকাংশ সাধারণ বিমা (General Insurance) এবং জীবন বিমা (Life Insurance) কোম্পানির মূল চুক্তিপত্র বা ‘পলিসি বন্ড’ এখনো ইংরেজিতে বা অত্যন্ত জটিল পরিভাষায় রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক কী সই করছেন, তা পুরোপুরি বুঝতে পারেন না।

১১) আবেদনপত্র লিফলেট: প্রচারণামূলক লিফলেট এবং বিমার আবেদনপত্র (Proposal Form) এখন অনেক কোম্পানি বাংলায় তৈরি করছে। তবে কারিগরি শব্দগুলো (যেমন: Premium, Grace Period, Surrender Value) বাংলায় অনুবাদ করার ক্ষেত্রে এখনো অনেক জড়তা রয়েছে।

– ডিজিটাল মাধ্যম: বিমা কোম্পানিগুলোর ওয়েবসাইট বা অ্যাপে বাংলার ব্যবহার বাড়ছে, তবে তা এখনো শতভাগ কার্যকর নয়।

১২) পরিপালনের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

বিমাখাতে পূর্ণাঙ্গ বাংলা ভাষা চালু না হওয়ার পেছনে কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে:

ক. আইনি পরিভাষা: বিমা একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসা। পুনঃবিমা (Re-insurance) এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইংরেজি শব্দের সঠিক বাংলা পরিভাষা খুঁজে পাওয়া বা তা আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠা করা বেশ জটিল।

খ) সচেতনতার অভাব: মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে গ্রাহককে বাংলায় বুঝিয়ে বলার প্রবণতা থাকলেও লিখিত নথিতে ইংরেজি ব্যবহারের প্রতি এক ধরণের নির্ভরশীলতা কাজ করে।

গ) কারিগরি সীমাবদ্ধতা: অনেক কোম্পানির সফটওয়্যার এবং ডাটাবেজ ইংরেজি ফরম্যাটে তৈরি, যা পরিবর্তন করা সময়সাপেক্ষ।

১৩) ইতিবাচক অগ্রগতি: সাম্প্রতিক সময়ে IDRA (বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ) কোম্পানিগুলোকে বিমা দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া এবং শর্তাবলি সহজ বাংলায় তুলে ধরার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। অনেক নতুন কোম্পানি এখন তাদের প্রোডাক্টগুলোর সারসংক্ষেপ বাংলায় প্রদান করছে যাতে গ্রাহক প্রতারিত না হন।


সারসংক্ষেপ: ভাষাগত বাধার কারণে বিমা খাত এখনো সমাজের একটি বড় অংশের কাছে “অজানা বা ভয়ের বস্তু” হিসেবে রয়ে গেছে। হাইকোর্টের নির্দেশ এবং আইডিআরএ-এর বর্তমান সক্রিয়তা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবেই দেশের সাধারণ মানুষ বিমা খাতের প্রকৃত সুবিধা ভোগ করতে পারবে। হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে তা এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও সাধারণ গ্রাহকদের সুরক্ষায় বিমা পলিসির মূল শর্তাবলি সহজ বাংলায় রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *