”ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকারের ১ বছরের সাফল্য”

মোঃ মানসুর আলম সিকদার, এম.বি. এ., এল এল. বিঃ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকারের ১ বছরের (আগস্ট ২০২৪ – আগস্ট ২০২৫) অর্জনগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুমাত্রিক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে তাঁর সরকার মূলত রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে নজর দিয়েছে।

নিচে গত এক বছরে তাঁর সরকারের প্রধান অর্জনগুলো তুলে ধরা হলো:

১. অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা

দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। গত এক বছরে এই খাতে বেশ কিছু দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে:

  • মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার পাশাপাশি সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার দাবি করা হয়েছে।
  • ব্যাংকিং খাত সংস্কার: ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ফেরাতে এবং তারল্য সংকট কাটাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণ বা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
  • বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স: প্রবাসীদের আস্থা বাড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে (এক বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি), যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল করেছে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছে।
  • শ্বেতপত্র প্রকাশ: দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে এবং বিগত সরকারের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের খতিয়ান প্রকাশ করতে অর্থনীতির ওপর একটি ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশ করা হয়েছে।

২. রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই চার্টার

ড. ইউনূসের সরকারের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের মৌলিক সংস্কার।

  • সংস্কার কমিশন গঠন: সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য পৃথক পৃথক কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই কমিশনগুলোর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের পথনকশা তৈরি হয়েছে।
  • জুলাই চার্টার (July Charter): ভবিষ্যতে যাতে স্বৈরাচারী শাসন ফিরে না আসে, তা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘জুলাই চার্টার’ বা রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাবনাও রয়েছে।

৩. বিচার ও জবাবদিহিতা

জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার সোচ্চার ছিল।

  • আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল: জুলাই গণহত্যার বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং বিচার কাজ শুরু হয়েছে।
  • গুম ও মানবাধিকার কমিশন: বিগত সময়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে স্বাধীন কমিশন কাজ করছে। আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালাগুলো বন্ধ করা হয়েছে।

৪. কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বেশ কিছু সুবিধা আদায় করেছে।

  • সার্ক পুনরুজ্জীবিতকরণ: দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (SAARC)-কে পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
  • পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শুল্ক ও বাণিজ্য নিয়ে সফল আলোচনা হয়েছে।
  • বিনিয়োগ বৃদ্ধি: বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণে সরকার সফল হয়েছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে।

৫. আইন-শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা

  • পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন: অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ভেঙে পড়া পুলিশি ব্যবস্থাকে পুনরায় সচল করা এবং পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান।
  • দুর্নীতি দমন: দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য টাস্কফোর্স গঠন করে কাজ শুরু করা হয়েছে।

সারসংক্ষেপ: ড. ইউনূসের ১ বছরের সরকারের মূল সাফল্য হলো একটি চরম অরাজক পরিস্থিতি থেকে দেশকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *